কবিতা | নির্বাসিত অনুভব | শামীম নিমু

 কবিতা | নির্বাসিত অনুভব | শামীম নিমু 


কফি-হাউজের অধোজ্যোতির নিস্তব্ধ অপচ্ছায়ায়,
সেদিন তোমাকে দেখলাম...
এক অপ্রবেশ্য, প্রায় অসংলগ্ন সত্তাবিভ্রমে নিমজ্জিত।
পরিসরের বাতাসে জমে থাকা
ধূলিমলিন অনুরণনের ক্ষুদ্রতম অনুকম্পাও
তোমার চারপাশে কোনো সঞ্চারে স্পর্শ করতে পারেনি;
তুমি ছিলে এমন এক সমগ্র-নির্বাসিত নিরুপেক্ষতায়-
যার আধ্যাত্মিক গহ্বরবৃত্তিতে
অনুভূতির প্রতিটি তরঙ্গ
হয়ে উঠেছিল স্তব্ধ, নির্ব্যঞ্জন, অনির্দেশ্য।

যে টেবিলের কাঠে
আমাদের অতলান্তিক সংলাপ-অবশেষ
অদ্যাবধি অজ্ঞাত অবশিষ্টতায় ঘুমিয়ে আছে,
অথচ তুমি আজ সেই টেবিলে বসেছিলে কোনো এক দুর্বোধ্য সহবস্তু-ছায়ার সঙ্গে,
যাহার অস্তিত্ব...
আমার সমগ্র সত্তার পরিধিতে গোপন অনারম্ভিক দংশন উৎপন্ন করছিল নিরবধি।

তোমার পরিহিত নীল শাড়িটির স্তরবিন্যাস
সেদিন ধারণ করেছিল
কি এক অদ্ভুত, প্রায় অতিপ্রাকৃত অশ্রাব্যতা,
যাহার রঞ্জনে ছিল
গাঢ়, অরন্ধ্র, পরিশীর্ণ নৈরাশ্যের
নির্বিকার দ্যুতি।
রেশমের প্রতিটি জটিল ভাঁজে
তুমি বহন করছিলে নির্লোম শীতলতায়,
যেন অতীতের সুকোমল কণাদল
অদৃশ্য নিষ্কাশনে
তুমি নিষ্ঠুরভাবে বর্জন করেছ।

তোমার দৃষ্টির তীক্ষ্ণ, অথচ পর্দাহীন দৃশ্যরেখায় ছিল এমন এক অসামান্য অচঞ্চলতা...
যেন দৃষ্টিজগতের নামমাত্র আলোও
তোমার মণিপটে প্রবেশ করতে
সংকোচিত হয়ে পড়ে।
এই অভেদ্য স্থৈর্যচ্ছায়ায় আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম...
স্মৃতির পরম পলিমাটিও
তোমার দৃষ্টিকোণে আর কোনো প্রতিরূপে উদ্ভাসিত হওয়ার অনুমতি পায়নি।

কফির কাপের কুণ্ডলিত বাষ্পীয়
তোমার আঙ্গুলের গতির সঙ্গে
কি এক অদ্ভুত, অচঞ্চল,
প্রায় অবচেতন যান্ত্রিক সমমিতিতে
ছড়িয়ে যাচ্ছিল;
সেই বাষ্প পর্যন্ত আমার স্মৃতির উষ্ণতা পরিত্যাগ করে নিষ্প্রাণ, শীতল, অনির্বচনীয় এক অস্পৃশ্য দূরত্বে লীন হয়ে গেল।

আমি তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম...
বোধ-দহনে ক্ষয়িষ্ণু নিগূঢ় শূন্যতাসংকুচনে,
যেখানে হৃদয়ের প্রতিটি বিকার
শব্দহীন উচ্ছেদে ভেঙে অচিহ্নিত ধুলোয় পরিণত হয়েছিল।
আমার চারপাশের পরিব্যাপ্ত আলো
ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল...
অবসাদঘন, অনভিভেদ্য দিগন্তে,
যেখানে আবেগের সমস্ত ইঙ্গিত
অদৃশ্য উত্তাপে ছাই হয়ে গিয়েছে।

সেই নীল শাড়িটি, সেই কাঠের চেয়ার,
সেই কফির নিঃসহানুভূতিময় গন্ধ...
সবই আজ নির্বিকার, অপরিবর্তিত, স্থবির;
অথচ তুমি...
তুমি ছিলে এমন এক অন্তর্গত দূরত্বের বিস্তৃত নৈঃস্পৃহতায় আবদ্ধ;
যেখানে কোনো স্মৃতি-উদ্গমন, কোনো অনুরাগ-পরিভব, কোনো বেদনাবিভ্রমই
আর প্রবেশাধিকার লাভ করে না।

সবকিছু মিলে আমি তখন উপলব্ধি করেছিলাম...
আসলে বিরহ কোনো শব্দ নয় অথবা কোনো অনুভূতিও নয়,
বরং এ হলো গভীর অন্ধকার, লুকায়িত, অব্যক্ত অতিশব্দিক শূন্যতার স্তম্ভ;
যেখানে হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন
অনির্ণেয় ও অপার্থিব নিঃশব্দতায়
ধীরে ধীরে আত্মবিলীন হয়ে যায়।


রচনাকালঃ ১৩-০১-২০২৬ইং।

Comments